Gram Bangla Report | আইন আদালত ডেস্ক
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক বাবা-মা আর আগের মতো উপার্জন করতে পারেন না। চিকিৎসা, ওষুধ, খাবার, বাসস্থান ও দৈনন্দিন খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়তে পারে। এমন পরিস্থিতিতে সন্তান যদি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও বাবা-মাকে ভরণপোষণ দিতে অস্বীকার করেন বা অবহেলা করেন, তাহলে ভারতীয় আইনে বাবা-মায়ের জন্য নির্দিষ্ট আইনি প্রতিকারের ব্যবস্থা রয়েছে।
প্রধানত Maintenance and Welfare of Parents and Senior Citizens Act, 2007-এর অধীনে বাবা-মা/প্রবীণ নাগরিক Maintenance Tribunal-এর কাছে আবেদন করতে পারেন। একই সঙ্গে পরিস্থিতি অনুযায়ী Bharatiya Nagarik Suraksha Sanhita (BNSS), 2023-এর Section 144-এর অধীনেও বাবা-মায়ের maintenance-এর ব্যবস্থা রয়েছে।
👴 ১. সন্তানের কি বাবা-মাকে ভরণপোষণ দেওয়ার আইনি দায়িত্ব রয়েছে?
হ্যাঁ—নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে রয়েছে।
Maintenance and Welfare of Parents and Senior Citizens Act, 2007-এর Section 4 অনুযায়ী, নিজের উপার্জন বা নিজের সম্পত্তির আয় থেকে নিজেকে রক্ষণাবেক্ষণ করতে অক্ষম এমন বাবা-মা তাঁদের প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের কাছে maintenance চাইতে পারেন।
আইনে বলা হয়েছে, সন্তানের দায়িত্ব এমনভাবে maintenance দেওয়া যাতে বাবা বা মা স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।
অর্থাৎ এটি শুধুমাত্র খাবারের খরচের বিষয় নয়; প্রয়োজন অনুযায়ী জীবনযাপনের মৌলিক চাহিদার বিষয়ও বিবেচিত হতে পারে।
🏠 ২. বাবা-মা কি শুধু ছেলের কাছেই দাবি করতে পারবেন?
না।
আইনে one or more children-এর বিরুদ্ধে আবেদন করার সুযোগ রয়েছে। অর্থাৎ পরিস্থিতি অনুযায়ী একাধিক প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের বিরুদ্ধেও আবেদন করা যেতে পারে।
তবে প্রত্যেক সন্তানের আর্থিক সামর্থ্য ও পরিস্থিতি বিবেচনা করে maintenance-এর দায়িত্ব নির্ধারণের প্রশ্ন আসতে পারে।
💰 ৩. কত টাকা ভরণপোষণ দিতে হবে?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—আইনে সবার জন্য একই নির্দিষ্ট মাসিক অঙ্ক নির্ধারণ করে দেওয়া নেই।
Maintenance Tribunal আবেদনকারীর প্রয়োজন এবং সন্তানের আর্থিক সামর্থ্যসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করে পরিমাণ নির্ধারণ করতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গের ২০০৮ সালের Rules-এ Tribunal-এর বিবেচনার বিষয়গুলির মধ্যে সন্তানের income, পরিবারের সদস্যসংখ্যা, সম্পত্তি/আর্থিক অবস্থা এবং আবেদনকারীর বর্তমান medical needs-এর মতো বিষয় রয়েছে।
⚖️ ৪. Maintenance Tribunal কী?
Maintenance Tribunal হলো এমন একটি বিশেষ ব্যবস্থা যেখানে বাবা-মা বা senior citizen ভরণপোষণের দাবি নিয়ে আবেদন করতে পারেন।
আইনের Section 7 অনুযায়ী রাজ্য সরকার প্রতিটি Sub-Division-এর জন্য এক বা একাধিক Maintenance Tribunal গঠন করে; Tribunal-এর presiding officer সাধারণত Sub-Divisional Officer-এর পদমর্যাদার কর্মকর্তা হন।
পশ্চিমবঙ্গেও এই ব্যবস্থা রয়েছে। রাজ্য সরকারের তথ্য অনুযায়ী, West Bengal Maintenance and Welfare of Parents and Senior Citizens Rules, 2008-এর অধীনে senior citizen-দের harassment ও family দ্বারা eviction-এর মতো বিষয়ও Tribunal-এর মাধ্যমে মোকাবিলা করা হয়।
📝 ৫. বাবা-মা কীভাবে আবেদন করবেন?
Maintenance Act-এর Section 5 অনুযায়ী—
বাবা বা মা নিজে আবেদন করতে পারেন।
যদি তিনি নিজে আবেদন করতে অক্ষম হন, তাহলে তাঁর অনুমোদিত ব্যক্তি বা সংগঠন তাঁর হয়ে আবেদন করতে পারে। এমনকি Tribunal নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে suo motu অর্থাৎ নিজ উদ্যোগেও বিষয়টি গ্রহণ করতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গে আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
West Bengal Rules অনুযায়ী Maintenance Tribunal-এ maintenance application-এর জন্য নির্ধারিত পদ্ধতি রয়েছে এবং parent/senior citizen-এর application-এর জন্য court fee বা অন্য কোনও fee নেওয়ার কথা নেই।
🩺 ৬. চিকিৎসার খরচ কি ভরণপোষণের অংশ হতে পারে?
হ্যাঁ, প্রয়োজনের মূল্যায়নে medical needs বিবেচনা করা হতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গের Rules-এ maintenance-এর পরিমাণ নির্ধারণের সময় আবেদনকারীর বর্তমান চিকিৎসার প্রয়োজন, জীবনযাত্রার অবস্থা এবং অন্যান্য আর্থিক বিষয় বিবেচনার কথা রয়েছে।
তাই বয়স্ক বাবা-মায়ের নিয়মিত ওষুধ, চিকিৎসা বা পরিচর্যার প্রয়োজন থাকলে তার নথি সংরক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
🏚️ ৭. সন্তান যদি বৃদ্ধ বাবা-মাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়?
এটি শুধু ভরণপোষণের বিষয় নয়; বাসস্থান ও নিরাপত্তার বিষয়ও হতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, senior citizen-রা পরিবার দ্বারা harassment বা eviction-এর শিকার হলে সংশ্লিষ্ট Tribunal-এর মাধ্যমে প্রতিকার পাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
West Bengal Rules-এ আরও বলা হয়েছে, proceeding চলাকালীন যদি দেখা যায় যে parent/senior citizen-এর থাকার জায়গা নেই বা তাঁকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে, Tribunal পরিস্থিতি অনুযায়ী shelter-এর ব্যবস্থা করার পদক্ষেপ নিতে পারে।
🏡 ৮. বাবা-মায়ের সম্পত্তি সন্তান নিয়ে নিয়েছে—তারপর দেখাশোনা করছে না?
এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
অনেক সময় বাবা-মা ভালোবাসা বা বিশ্বাসের কারণে বাড়ি/সম্পত্তি সন্তানের নামে করে দেন। পরে সেই সন্তান যদি বাবা-মায়ের দেখাশোনা না করেন বা তাঁদের পরিত্যাগ করেন, তখন আইনি প্রতিকারের প্রশ্ন উঠতে পারে।
Maintenance and Welfare of Parents and Senior Citizens Act-এর Section 23-এ নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে senior citizen-এর property transfer বাতিল ঘোষণার ব্যবস্থা রয়েছে—বিশেষ করে transfer-এর সঙ্গে basic physical needs দেওয়ার শর্ত যুক্ত থাকলে এবং transferee সেই obligation পালন না করলে।
অতএব, সম্পত্তি হস্তান্তরের দলিল, শর্ত এবং বাস্তব পরিস্থিতি না দেখে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।
⚖️ ৯. BNSS-এর Section 144-এও maintenance চাওয়া যায়
Maintenance Tribunal ছাড়াও একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি পথ হলো Bharatiya Nagarik Suraksha Sanhita, 2023-এর Section 144।
এই ধারায় বলা হয়েছে, পর্যাপ্ত সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোনও ব্যক্তি তাঁর অসহায় বাবা বা মাকে maintain না করলে Magistrate, প্রমাণের ভিত্তিতে, মাসিক maintenance দেওয়ার আদেশ করতে পারেন।
এখানে father or mother unable to maintain himself/herself হওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থাৎ একই ধরনের সমস্যায় কোন আইনি পথ বেশি উপযুক্ত হবে, তা নির্ভর করবে ঘটনা ও নথির ওপর।
⏳ ১০. Interim Maintenance-ও হতে পারে
Maintenance Act-এর Section 5 অনুযায়ী মূল মামলার শুনানি চলাকালীন Tribunal interim maintenance দেওয়ার নির্দেশ দিতে পারে।
অর্থাৎ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করেই যে বাবা-মাকে সব খরচ চালাতে হবে, এমন নয়।
আইনে maintenance application-এর proceeding নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তির লক্ষ্যের কথাও বলা হয়েছে—notice service-এর পর 90 দিনের মধ্যে, বিশেষ পরিস্থিতিতে আরও সর্বোচ্চ 30 দিন বাড়ানোর সুযোগসহ।
📄 ১১. আবেদন করার আগে কী কী নথি প্রস্তুত রাখবেন?
সম্ভব হলে সংগ্রহ করুন—
- বাবা/মায়ের পরিচয়পত্র
- বয়সের প্রমাণ
- সন্তানের নাম ও ঠিকানা
- সন্তানের আর্থিক সামর্থ্য সম্পর্কে প্রাসঙ্গিক তথ্য
- চিকিৎসার কাগজপত্র
- ওষুধের খরচ
- pension-এর তথ্য
- ব্যাংক/আয়ের তথ্য, যেখানে প্রাসঙ্গিক
- সম্পত্তির নথি
- সন্তানকে পাঠানো written request/notice
- WhatsApp/SMS বা অন্যান্য যোগাযোগ
- বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হলে তার প্রমাণ
- পূর্বের পুলিশ অভিযোগ/জিডি/আদালতের নথি, যদি থাকে।
সব প্রমাণ সংগ্রহ করতে গিয়ে নিজের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলবেন না।
🤝 ১২. মামলা করার আগে মীমাংসার সুযোগও রয়েছে
আইনটি শুধু মামলা-মোকদ্দমার পথ দেখায় না।
Maintenance Tribunal hearing-এর আগে বিষয়টি Conciliation Officer-এর কাছে পাঠাতে পারে, যাতে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান সম্ভব কি না দেখা যায়। সমঝোতা হলে Tribunal সেই অনুযায়ী order দিতে পারে।
পরিবারের সম্পর্ক বজায় রেখে সমস্যার সমাধান সম্ভব হলে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ হতে পারে।
🚨 ১৩. বৃদ্ধ বাবা-মাকে নির্যাতন করা হলে
যদি ভরণপোষণের অভাবের পাশাপাশি—
- মারধর,
- হুমকি,
- জোর করে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া,
- সম্পত্তি দখলের চেষ্টা,
- মানসিক নির্যাতন,
- গুরুতর নিরাপত্তার সমস্যা
থাকে, তাহলে শুধু maintenance application-এর ওপর নির্ভর না করে পরিস্থিতি অনুযায়ী পুলিশ ও অন্যান্য উপযুক্ত আইনি কর্তৃপক্ষের সাহায্য নেওয়া উচিত।
জরুরি বিপদে 112-এ যোগাযোগ করা যায়।
🌾 গ্রাম বাংলার মানুষের জন্য সহজ আইনি পথ
বৃদ্ধ বাবা-মা অবহেলিত → প্রমাণ সংগ্রহ → সন্তানকে লিখিতভাবে জানানো → সমঝোতার চেষ্টা → Maintenance Tribunal/উপযুক্ত Magistrate-এর আইনি পথ → প্রয়োজনে আইনজীবীর সাহায্য।
পশ্চিমবঙ্গে Maintenance Tribunal ব্যবস্থা সাধারণত Sub-Division স্তরে রয়েছে; সংশ্লিষ্ট SDO/Tribunal-এর কাছে প্রক্রিয়া সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া যেতে পারে।
📰 আইন আদালত ডেস্কের বিশেষ বার্তা
বৃদ্ধ বাবা-মায়ের যত্ন নেওয়া শুধু নৈতিক দায়িত্বের বিষয় নয়; নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এটি আইনি দায়িত্বও হতে পারে।
তবে প্রতিটি পারিবারিক বিরোধের আইনি ফল এক নয়। বাবা-মায়ের নিজস্ব আয় ও সম্পত্তি, সন্তানের আর্থিক সামর্থ্য, বাস্তব প্রয়োজন, সম্পত্তি হস্তান্তর এবং নির্যাতন/পরিত্যাগের পরিস্থিতি—সবকিছু বিবেচনা করা হয়।
Gram Bangla Report — আইন আদালত
আইন জানুন • প্রবীণ বাবা-মায়ের অধিকার বুঝুন • প্রয়োজনে সঠিক আইনি পথে এগিয়ে যান
আইনি সতর্কতা: এই প্রতিবেদনটি সাধারণ আইন-সচেতনতার উদ্দেশ্যে। নির্দিষ্ট পারিবারিক বা সম্পত্তি-সংক্রান্ত ঘটনায় নথিপত্র দেখে যোগ্য আইনজীবী, Maintenance Tribunal বা Legal Services Authority-এর পরামর্শ নেওয়া উচিত।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন