নিজস্ব প্রতিবেদন:
আজও বাংলা সাংবাদিকতার ইতিহাসে শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয় বরুণ সেনগুপ্তের নাম। তিনি শুধুমাত্র একজন সাংবাদিক ছিলেন না, বরং সংবাদপত্রকে সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে অন্যতম পথিকৃৎ ছিলেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত 'বর্তমান' দৈনিক বাংলা সংবাদপত্র পশ্চিমবঙ্গের সংবাদজগতে এক নতুন যুগের সূচনা করে।
জন্ম ও শৈশব
বরুণ সেনগুপ্ত ১৯৩৪ সালের ২৩ জানুয়ারি তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বরিশালে (বর্তমান বাংলাদেশ) জন্মগ্রহণ করেন। দেশভাগের আগে তাঁর পরিবার কলকাতায় চলে আসে। কলকাতার টাউন স্কুলে পড়াশোনা করেন এবং পরে সিটি কলেজ থেকে বাণিজ্যে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
সাংবাদিকতা জীবনের শুরু
১৯৫৭ সালে তিনি সাংবাদিকতা শুরু করেন। ১৯৬০ সালে আনন্দবাজার পত্রিকায় যোগ দেন এবং ১৯৬৫ সালে সেই প্রতিষ্ঠানের প্রথম রাজনৈতিক সংবাদদাতা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। জরুরি অবস্থার (Emergency) সময় তাঁর নির্ভীক লেখালেখির জন্য তাঁকে কারাবাসও করতে হয়। এই অভিজ্ঞতা থেকেই পরে তিনি লেখেন বহুল আলোচিত গ্রন্থ "ইন্দিরা একাদশী"।
'বর্তমান' সংবাদপত্রের প্রতিষ্ঠা
১৯৮৪ সালের ৭ ডিসেম্বর তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বর্তমান দৈনিক। সহজ ভাষা, তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক বিশ্লেষণ এবং ক্ষমতার সমালোচনামূলক অবস্থানের জন্য পত্রিকাটি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। পরবর্তীতে সাপ্তাহিক বর্তমান ও সুখী গৃহকোণ-ও প্রকাশ করেন।
লেখক হিসেবে অবদান
বরুণ সেনগুপ্ত সাংবাদিকতার পাশাপাশি একজন শক্তিশালী লেখকও ছিলেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য বইগুলির মধ্যে রয়েছে—
পালা বদলের পালা
সব চরিত্র কাল্পনিক
ইন্দিরা একাদশী
অন্ধকারের অন্তরালে
নেতাজির অন্তর্ধান রহস্য
মৃত্যু
২০০৮ সালের ১৯ জুন কলকাতায় ৭৪ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর প্রয়াণে বাংলা সাংবাদিকতা এক নির্ভীক কণ্ঠস্বর হারায়।
বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তাঁর অভাব কতটা?
বরুণ সেনগুপ্তের অভাব নিয়ে বহু সাংবাদিক, পাঠক ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক আলোচনা করেন। কারণ তিনি ক্ষমতাসীন বা বিরোধী—কোনও পক্ষের অন্ধ সমর্থক হিসেবে পরিচিত ছিলেন না; বরং তাঁর পরিচয় ছিল একজন কঠোর রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে। আজকের রাজনৈতিক পরিবেশে অনেকেই মনে করেন, তাঁর মতো স্পষ্টভাষী বিশ্লেষক থাকলে জনমত আরও সমৃদ্ধ হতো। তবে এটি একটি মূল্যায়নভিত্তিক মত, সর্বজনস্বীকৃত সত্য নয়।
মিডিয়া জগতে তাঁর প্রভাব
বরুণ সেনগুপ্ত বাংলা সাংবাদিকতায় কয়েকটি বড় পরিবর্তন আনেন—
রাজনৈতিক সংবাদকে সাধারণ পাঠকের কাছে সহজ ভাষায় পৌঁছে দেন।
অনুসন্ধানী ও বিশ্লেষণধর্মী সাংবাদিকতাকে জনপ্রিয় করেন।
নতুন প্রজন্মের বহু সাংবাদিককে অনুপ্রাণিত করেন।
'বর্তমান'কে পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম প্রভাবশালী বাংলা দৈনিকে পরিণত করেন।
তাঁর মৃত্যুতে ক্ষতি
তাঁর মৃত্যুর পর অনেকেই মনে করেন বাংলা সাংবাদিকতা একজন সাহসী সম্পাদক, বিশ্লেষক ও জনমুখী লেখককে হারিয়েছে। তাঁর মৃত্যুর পরে তাঁর বোন শুভা দত্ত সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব নেন এবং পত্রিকার ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন।
বরুণ সেনগুপ্ত ছিলেন এমন এক সাংবাদিক, যিনি সংবাদপত্রকে কেবল খবরের কাগজ নয়, জনমতের শক্তিশালী মঞ্চে পরিণত করেছিলেন। তাঁর নির্ভীক লেখনী, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ এবং সাধারণ মানুষের ভাষায় কথা বলার ক্ষমতা তাঁকে বাংলা সাংবাদিকতার ইতিহাসে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে। তাঁর আদর্শ আজও সাংবাদিকতার স্বাধীনতা, জবাবদিহি এবং সত্য অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক।
Post a Comment