স্থান: সালার, মুর্শিদাবাদ
বিভাগ: রাজ্য / জনদুর্ভোগ
নিজস্ব প্রতিনিধি, সালার: মুর্শিদাবাদের সালার রেল স্টেশন চত্বরে রেল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে আকস্মিক উচ্ছেদ নোটিশ জারির পর থেকে স্থানীয় বস্তিবাসী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক, ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। হঠাৎ করে মাথার ওপর থেকে ছাদ চলে যাওয়া এবং জীবিকা বন্ধ হওয়ার আশঙ্কায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন এলাকার শতাধিক মানুষ।
গত শুক্রবার সকালে রেল পুলিশ (GRP) এবং সালার থানার এক বিশাল পুলিশ বাহিনী যৌথভাবে স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় অভিযান চালায়। তারা সেখানে দীর্ঘ বহু বছর ধরে বসবাসকারী এবং ব্যবসা করা সাধারণ মানুষের হাতে উচ্ছেদ নোটিশ তুলে দেয়। এই নোটিশে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, আগামী ১৬ জুলাইয়ের মধ্যে রেলের জমি সম্পূর্ণ খালি করে দিতে হবে। একই সাথে নোটিশে বাসিন্দাদের নিজেদের উদ্যোগে সমস্ত মালপত্র এবং ঘরবাড়ির নির্মাণ সামগ্রী সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অন্যথায়, ১৭ জুলাই থেকে রেল কর্তৃপক্ষ আইন মোতাবেক বড় ধরনের উচ্ছেদ অভিযান চালাবে বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে।
আমতলা বস্তির অসহায়তা ও জীবিকার সংকট: সালার স্টেশন সংলগ্ন আমতলা বস্তিতে প্রায় ৩০টিরও বেশি পরিবার দীর্ঘ বহু বছর ধরে মাথা গোঁজার ঠাঁই করে বসবাস করে আসছেন। এই পরিবারগুলোর অর্থনৈতিক অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। এদের মধ্যে কেউ ভিক্ষাবৃত্তি করে কোনোমতে দিনাতিপাত করেন, আবার কেউ অন্য মানুষের বাড়িতে পরিচারিকার কাজ করে বা দিনমজুরি খেটে সংসার চালান। টিনের তৈরি ছোট ছোট ঘরগুলোই এই হতদরিদ্র মানুষগুলোর একমাত্র আশ্রয়স্থল।
নোটিশ হাতে পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়া এক বাসিন্দা জানান, "রেল জমি দখলমুক্ত হলে আমরা শেষমেশ যাব কোথায়? পরিবার-পরিজন আর ছোট ছোট সন্তানদের নিয়ে কীভাবে বাঁচব? আমাদের পুনর্বাসনের কোনো ব্যবস্থা না করে এভাবে তাড়িয়ে দিলে আমাদের মরণ ছাড়া উপায় নেই।"
অন্যদিকের চিত্রটাও সমানে ভয়াবহ। সালার স্টেশন চত্বরে ১৫ থেকে ৩০ বছর ধরে ছোটখাটো দোকানপাট চালিয়ে ব্যবসা করছেন বহু ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। দোকানদারদের দাবি, তাদের পুরো পরিবারের রুজি-রোজগার সম্পূর্ণভাবে এই ব্যবসাগুলোর ওপরই নির্ভরশীল। হঠাৎ করে দোকান তুলে দিতে হলে তারা শুধু গৃহহীনই হবেন না, বরং স্থায়ীভাবে উপার্জনের পথ হারিয়ে অনাহারে পড়ার উপক্রম হবে।
প্রবীণদের হাহাকার ও মানবিক বিপর্যয়: উচ্ছেদের এই অমানবিক নোটিশ হাতে পেয়ে বহু অসহায় পরিবার কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। বিশেষ করে এলাকার বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের কণ্ঠে শোনা যাচ্ছে চরম হাহাকার আর আকুল আর্তনাদ।
এক প্রবীণ বাসিন্দা তার শারীরিক ও পারিবারিক অসহায়তার কথা তুলে ধরে ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, "এই বয়সে, খোঁড়া পা নিয়ে আমি কোথায় যাব? ছোট ছোট সন্তান আর নাতি-নাতনিদের নিয়ে এই টিনের ঘরেই কোনোমতে থাকি। সামান্য বৃষ্টি হলেই ছাদ দিয়ে জল পড়ে, অভাবের তাড়নায় সেটাও মেরামত করার সামর্থ্য নেই। এখন যদি এই ঘরটুকুও কেড়ে নেওয়া হয়, তাহলে আমাদের মাথা গোঁজার আর কোনো ঠাঁই থাকবে না।"
নোটিশের মূল সময়সীমা: * ১৬ জুলাই: রেলের জমি খালি করে নিজেদের মালামাল ও ঘর সরানোর শেষ সময়সীমা।
১৭ জুলাই: রেল কর্তৃপক্ষ ও পুলিশ প্রশাসনের যৌথ উচ্ছেদ অভিযান শুরুর নির্ধারিত দিন।
উচ্ছেদ নোটিশ জারির পর থেকে পুরো সালার স্টেশন এলাকায় এক থমথমে ও বেদনাদায়ক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও মানবিক সংগঠনগুলোর দাবি—রেল কর্তৃপক্ষ তাদের উচ্ছেদ করার আগে যেন অবশ্যই মানবিক দিক বিবেচনা করে বিকল্প বাসস্থান বা পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণ করে। অন্যথায় শত শত মানুষ খোলা আকাশের নিচে এসে দাঁড়াবে, যা এক চরম মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনবে

Post a Comment