বাংলা ভাষা ও ব্যাকরণের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় হলো ধ্বনিতত্ত্ব। দ্বাদশ শ্রেণির বর্তমান বাংলা-A পাঠ্যক্রমের তৃতীয় সেমেস্টারে ‘ভাষা’ অংশের দ্বিতীয় অধ্যায় হিসেবে ধ্বনিতত্ত্ব নির্ধারিত রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সংসদের প্রকাশিত সংশোধিত পাঠ্যসূচিতে ‘ভাষাবিজ্ঞান ও তার শাখা-প্রশাখা’, ‘ধ্বনিতত্ত্ব’ এবং ‘শব্দার্থতত্ত্ব’—এই বিষয়গুলি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
ধ্বনিতত্ত্ব প্রথমে একটু কঠিন মনে হলেও বিষয়টি আসলে ভাষায় ব্যবহৃত ধ্বনির প্রকৃতি ও ব্যবহারকে বোঝার একটি সুসংবদ্ধ পদ্ধতি। তাই পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় শুধু সংজ্ঞা মুখস্থ না করে ধ্বনি, ধ্বনিবিজ্ঞান ও ধ্বনিতত্ত্বের পার্থক্য, স্বরধ্বনি-ব্যঞ্জনধ্বনি, ব্যঞ্জনধ্বনির শ্রেণিবিভাগ এবং উচ্চারণস্থান—এই বিষয়গুলি পরিষ্কারভাবে বোঝা জরুরি।
ধ্বনি কাকে বলে?
মানুষ যখন মুখ, জিহ্বা, তালু, দাঁত, কণ্ঠ ইত্যাদির সাহায্যে নিয়ন্ত্রিতভাবে বায়ুপ্রবাহ ব্যবহার করে কোনো ভাষিক উচ্চারণ সৃষ্টি করে এবং সেই উচ্চারণ ভাষায় অর্থবহ ব্যবহারের অংশ হয়, তখন তাকে ধ্বনি হিসেবে বোঝা যায়।
সহজ উদাহরণ হিসেবে ‘কলম’ শব্দটি ধরা যাক। আমরা শব্দটি উচ্চারণ করার সময় একটিমাত্র অবিচ্ছিন্ন শব্দ শুনলেও তার মধ্যে একাধিক ধ্বনির উপস্থিতি রয়েছে। ভাষার শব্দ গঠনের ক্ষেত্রে এই ধ্বনিগুলির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তবে মনে রাখতে হবে, বর্ণ এবং ধ্বনি এক জিনিস নয়। বর্ণ হলো লিখিত ভাষায় ধ্বনিকে প্রকাশ করার চিহ্ন; আর ধ্বনি হলো উচ্চারিত ভাষার উপাদান। বাংলা ভাষায় বর্ণ ও ধ্বনির সম্পর্ক সব সময় এক-একভাবে মেলে না—উচ্চারণের ক্ষেত্রে একই বর্ণ ভিন্ন পরিবেশে ভিন্নভাবে ধ্বনিত হতে পারে। উচ্চমাধ্যমিকের নির্ধারিত পাঠ্যেও বর্ণ ও ধ্বনির এই সম্পর্কের বিষয়টি ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
ধ্বনিবিজ্ঞান ও ধ্বনিতত্ত্বের পার্থক্য
এখানেই পরীক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি হতে পারে—ধ্বনিবিজ্ঞান ও ধ্বনিতত্ত্ব কি একই বিষয়?
না, দুটির আলোচনার ক্ষেত্র আলাদা।
ধ্বনিবিজ্ঞান ভাষার ধ্বনির উচ্চারণগত, শ্রুতিগত এবং ধ্বনিতরঙ্গগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে।
অন্যদিকে ধ্বনিতত্ত্ব কোনো নির্দিষ্ট ভাষায় সেই ধ্বনিগুলি কীভাবে ব্যবহৃত হয় এবং তাদের ব্যবহারিক চরিত্র কী—তা বিশ্লেষণ করে। পশ্চিমবঙ্গ উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সংসদের নির্ধারিত পাঠ্যেও এই পার্থক্যটি স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
অর্থাৎ সহজভাবে মনে রাখা যায়—
ধ্বনিবিজ্ঞান = ধ্বনি কীভাবে উচ্চারিত ও শোনা হয়
ধ্বনিতত্ত্ব = নির্দিষ্ট ভাষায় ধ্বনি কীভাবে ব্যবহৃত হয়
ধ্বনির প্রধান শ্রেণিবিভাগ
বাংলা ভাষার বাগধ্বনিকে প্রধানত দুই ভাগে আলোচনা করা হয়—
১. বিভাজ্যধ্বনি
এর মধ্যে রয়েছে—
স্বরধ্বনি
ব্যঞ্জনধ্বনি
২. অবিভাজ্যধ্বনি
এর মধ্যে রয়েছে—
দৈর্ঘ্য
শ্বাসাঘাত
যতি
সুরতরঙ্গ
এই বিভাজনটি ধ্বনিতত্ত্বের প্রাথমিক ধারণা বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। নির্ধারিত পাঠ্যেও বাগধ্বনির এই শ্রেণিবিভাগ উল্লেখ করা হয়েছে।
স্বরধ্বনি কী?
যে ধ্বনি উচ্চারণের সময় ফুসফুস থেকে বেরিয়ে আসা বায়ু মুখগহ্বরের মধ্যে কোনো উল্লেখযোগ্য বাধা ছাড়াই বেরিয়ে আসে, তাকে স্বরধ্বনি বলা হয়।
বাংলা ভাষার স্বরধ্বনি নির্ধারণে জিহ্বার অবস্থান ও ওষ্ঠের আকৃতি গুরুত্বপূর্ণ। নির্ধারিত পাঠ্য অনুযায়ী, মৌলিক স্বরধ্বনির সঙ্গে তুলনা করে বাংলা ভাষার স্বরধ্বনির উচ্চারণস্থান ও শ্রেণিবিভাগ বিশ্লেষণ করা হয়। পাঠ্যটিতে মান বাংলায় ৭টি স্বরধ্বনি চিহ্নিত করার বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে।
শিক্ষার্থীদের এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে—স্বরবর্ণ এবং স্বরধ্বনি এক নয়। স্বরবর্ণ হলো লিখিত চিহ্ন, আর স্বরধ্বনি হলো উচ্চারিত ভাষিক একক।
ব্যঞ্জনধ্বনি কী?
যে ধ্বনি উচ্চারণের সময় ফুসফুস থেকে বেরিয়ে আসা বায়ু মুখগহ্বরের কোনো না কোনো স্থানে বাধা পায় বা উচ্চারণযন্ত্রের সাহায্যে তার প্রবাহ নিয়ন্ত্রিত হয়, তাকে ব্যঞ্জনধ্বনি বলা হয়।
বাংলা ব্যঞ্জনধ্বনিকে আবার বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়। যেমন—
স্পর্শধ্বনি
অন্তঃস্থধ্বনি
উষ্মধ্বনি
এছাড়া ঘোষ-অঘোষ, অল্পপ্রাণ-মহাপ্রাণ, নাসিক্য ইত্যাদি বৈশিষ্ট্য অনুসারেও ব্যঞ্জনধ্বনির আলোচনা করা হয়।
স্পর্শধ্বনি
উচ্চারণের সময় উচ্চারণযন্ত্রের দুটি অংশ পরস্পরের সংস্পর্শে এসে বায়ুপ্রবাহকে সাময়িকভাবে বাধা দিলে যে ব্যঞ্জনধ্বনি তৈরি হয় তাকে স্পর্শধ্বনি বলা হয়।
বাংলা বর্ণমালার ক থেকে ম পর্যন্ত পঁচিশটি ধ্বনিকে স্পর্শধ্বনি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এগুলি পাঁচটি বর্গে বিভক্ত—
ক-বর্গ: ক, খ, গ, ঘ, ঙ
চ-বর্গ: চ, ছ, জ, ঝ, ঞ
ট-বর্গ: ট, ঠ, ড, ঢ, ণ
ত-বর্গ: ত, থ, দ, ধ, ন
প-বর্গ: প, ফ, ব, ভ, ম
এই ২৫টি ধ্বনি পরীক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অন্তঃস্থধ্বনি ও উষ্মধ্বনি
অন্তঃস্থধ্বনি উচ্চারণের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ স্পর্শ বা সম্পূর্ণ বাধা তৈরি হয় না। বাংলা ধ্বনির আলোচনায় য, র, ল প্রভৃতি ধ্বনির বিশেষ ভূমিকা রয়েছে।
অন্যদিকে উষ্মধ্বনি উচ্চারণের সময় বায়ু সংকীর্ণ পথ দিয়ে বেরিয়ে এসে ঘর্ষণজাত শব্দ সৃষ্টি করে। শ, ষ, স, হ প্রভৃতি ধ্বনি এই আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ।
ঘোষ ও অঘোষ ধ্বনি
ধ্বনি উচ্চারণের সময় স্বরতন্ত্রী কম্পিত হচ্ছে কি না, তার ভিত্তিতেও ধ্বনির শ্রেণিবিভাগ করা হয়।
অঘোষ ধ্বনি: উচ্চারণের সময় স্বরতন্ত্রীর কম্পন থাকে না।
ঘোষ ধ্বনি: উচ্চারণের সময় স্বরতন্ত্রীর কম্পন থাকে।
বাংলা ব্যঞ্জনধ্বনির বর্গগুলিতে প্রথম ও দ্বিতীয় ধ্বনি অঘোষ এবং তৃতীয় ও চতুর্থ ধ্বনি ঘোষ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়; পঞ্চম ধ্বনিগুলি নাসিক্য। যেমন ক-বর্গে ক, খ অঘোষ; গ, ঘ ঘোষ; ঙ নাসিক্য। এই বিন্যাস পাঁচটি বর্গেই প্রযোজ্য।
অল্পপ্রাণ ও মহাপ্রাণ
উচ্চারণের সময় বায়ু নির্গমনের মাত্রার পার্থক্যের ভিত্তিতেও ব্যঞ্জনধ্বনির শ্রেণিবিভাগ করা হয়।
প্রতিটি বর্গের দ্বিতীয় ও চতুর্থ ধ্বনিকে সাধারণভাবে মহাপ্রাণ বলা হয়। যেমন—
খ, ছ, ঠ, থ, ফ ইত্যাদি।
আর বর্গের প্রথম ও তৃতীয় ধ্বনিগুলি অল্পপ্রাণ হিসেবে চিহ্নিত হয়।
নাসিক্য ধ্বনি
যে ধ্বনি উচ্চারণের সময় বায়ুর একটি অংশ নাসারন্ধ্র দিয়ে বেরিয়ে আসে তাকে নাসিক্য ধ্বনি বলা হয়।
বাংলার পাঁচটি বর্গের পঞ্চম ধ্বনিগুলি হলো—
ঙ, ঞ, ণ, ন, ম
এগুলি পরীক্ষায় সরাসরি তালিকা আকারে জিজ্ঞাসা করা হতে পারে।
ধ্বনির উচ্চারণস্থান
ব্যঞ্জনধ্বনি কোন উচ্চারণস্থানে উৎপন্ন হচ্ছে, সেটিও ধ্বনিতত্ত্বের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
যেমন—
কণ্ঠ্য: ক, খ, গ, ঘ, ঙ
তালব্য: চ, ছ, জ, ঝ, ঞ
মূর্ধন্য: ট, ঠ, ড, ঢ, ণ
দন্ত্য: ত, থ, দ, ধ, ন
ওষ্ঠ্য: প, ফ, ব, ভ, ম
এই পাঁচটি বর্গের বিন্যাস ভালোভাবে মনে রাখলে ধ্বনির উচ্চারণস্থান সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর দেওয়া অনেক সহজ হয়।
পরীক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১. ধ্বনিতত্ত্বের আলোচ্য বিষয় কী?
উত্তর: একটি নির্দিষ্ট ভাষার বাগধ্বনির ব্যবহারিক চরিত্র বিশ্লেষণ করাই ধ্বনিতত্ত্বের প্রধান আলোচ্য বিষয়।
প্রশ্ন ২. বাগধ্বনি প্রধানত কত প্রকার?
উত্তর: বাগধ্বনি প্রধানত দুই প্রকার—বিভাজ্যধ্বনি ও অবিভাজ্যধ্বনি।
প্রশ্ন ৩. বিভাজ্যধ্বনি কত প্রকার?
উত্তর: বিভাজ্যধ্বনি দুই প্রকার—স্বরধ্বনি ও ব্যঞ্জনধ্বনি।
প্রশ্ন ৪. স্পর্শধ্বনি কতটি?
উত্তর: বাংলা ভাষায় ক থেকে ম পর্যন্ত ২৫টি ধ্বনিকে স্পর্শধ্বনি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
প্রশ্ন ৫. পাঁচটি নাসিক্য ধ্বনি কী কী?
উত্তর: ঙ, ঞ, ণ, ন, ম।
প্রশ্ন ৬. ধ্বনিবিজ্ঞান ও ধ্বনিতত্ত্বের পার্থক্য কী?
উত্তর: ধ্বনিবিজ্ঞান ধ্বনির উচ্চারণগত, শ্রুতিগত ও ধ্বনিতরঙ্গগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে; ধ্বনিতত্ত্ব নির্দিষ্ট ভাষায় ধ্বনির ব্যবহারিক চরিত্র বিশ্লেষণ করে।
দ্রুত রিভিশন
ধ্বনিতত্ত্ব → নির্দিষ্ট ভাষায় ধ্বনির ব্যবহারিক চরিত্র
বাগধ্বনি → বিভাজ্য + অবিভাজ্য
বিভাজ্য → স্বরধ্বনি + ব্যঞ্জনধ্বনি
স্পর্শধ্বনি → ২৫টি
পাঁচ বর্গের পঞ্চম ধ্বনি → ঙ, ঞ, ণ, ন, ম
প্রথম ও দ্বিতীয় ধ্বনি → অঘোষ
তৃতীয় ও চতুর্থ ধ্বনি → ঘোষ
দ্বিতীয় ও চতুর্থ ধ্বনি → মহাপ্রাণ
শেষ কথা
ধ্বনিতত্ত্ব অধ্যায়টি ভালোভাবে আয়ত্ত করতে হলে শুধু সংজ্ঞা মুখস্থ করলেই হবে না। প্রথমে ধ্বনি ও বর্ণের পার্থক্য, তারপর ধ্বনিবিজ্ঞান ও ধ্বনিতত্ত্বের পার্থক্য, এরপর বাগধ্বনির শ্রেণিবিভাগ, এবং সবশেষে স্বরধ্বনি, ব্যঞ্জনধ্বনি, স্পর্শধ্বনি, ঘোষ-অঘোষ, অল্পপ্রাণ-মহাপ্রাণ ও উচ্চারণস্থান—এই ধারায় পড়লে বিষয়টি অনেক সহজ হবে।
দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হলো প্রতিটি শ্রেণিবিভাগের সঙ্গে অন্তত দু-একটি উদাহরণ মনে রাখা। বিশেষ করে পাঁচটি বর্গের ২৫টি স্পর্শধ্বনি এবং পাঁচটি নাসিক্য ধ্বনি নিয়মিত লিখে অনুশীলন করলে পরীক্ষায় ভুলের সম্ভাবনা অনেক কমে যাবে।
গ্রাম বাংলা শিক্ষা — মুখস্থ নয়, বুঝে পড়ো; ধ্বনির গঠন বুঝলে বাংলা ব্যাকরণও সহজ হয়ে যাবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন