বাঙ্গালা ভাষা — স্বামী বিবেকানন্দ
১. লেখক পরিচিতি
স্বামী বিবেকানন্দ (১৮৬৩–১৯০২) ছিলেন ভারতীয় নবজাগরণের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব। তাঁর পূর্বাশ্রমের নাম ছিল নরেন্দ্রনাথ দত্ত। তিনি ধর্মচিন্তক, দার্শনিক, সমাজসংস্কারক ও অসাধারণ বক্তা হিসেবে ভারত তথা বিশ্বের মানুষের কাছে পরিচিত।
তাঁর চিন্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল—জ্ঞান ও শিক্ষাকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। সেই ভাবনারই প্রতিফলন দেখা যায় ‘বাঙ্গালা ভাষা’ প্রবন্ধে। তিনি মনে করতেন, মানুষের কাছে পৌঁছাতে হলে মানুষের বোধগম্য ভাষায় কথা বলতে হবে।
২. প্রবন্ধটির উৎস ও রচনাকাল
‘বাঙ্গালা ভাষা’ প্রবন্ধটি মূলত ১৯০০ খ্রিস্টাব্দের ২০ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা থেকে ‘উদ্বোধন’ পত্রিকার সম্পাদককে লেখা স্বামী বিবেকানন্দের একটি চিঠির অংশ। পরে এটি তাঁর ‘ভাববার কথা’ গ্রন্থে ‘বাঙ্গালা ভাষা’ নামে সংকলিত হয়। মূল পাঠের এই উৎস-তথ্যটি উইকিসংকলনেও সংরক্ষিত রয়েছে।
৩. প্রবন্ধের মূল বিষয়
‘বাঙ্গালা ভাষা’ প্রবন্ধের কেন্দ্রে রয়েছে সহজ, স্বাভাবিক ও জীবন্ত ভাষার ব্যবহার।
স্বামী বিবেকানন্দ মনে করেন, ভাষার প্রধান উদ্দেশ্য হলো ভাবকে সহজে প্রকাশ করা এবং অন্যের কাছে তা পৌঁছে দেওয়া। ভাষা যদি অতি দুরূহ, কৃত্রিম ও অলংকারবহুল হয়ে ওঠে, তাহলে সাধারণ মানুষ সেই ভাষা সহজে বুঝতে পারে না।
তাই তিনি বাংলা লেখার ক্ষেত্রে মানুষের মুখের ভাষাকে গুরুত্ব দেওয়ার পক্ষে মত প্রকাশ করেছেন।
৪. সংস্কৃত ভাষা ও সাধারণ মানুষের মধ্যে দূরত্ব
প্রবন্ধের শুরুতেই স্বামী বিবেকানন্দ দেখিয়েছেন যে প্রাচীন ভারতে বিদ্যার প্রধান বাহন ছিল সংস্কৃত। ফলে যারা সংস্কৃত জানতেন, তাঁরা জ্ঞান ও শিক্ষার জগতে এগিয়ে ছিলেন; কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে সেই জ্ঞান অনেক সময় সহজে পৌঁছাত না।
এর ফলে বিদ্বান ও সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি বড় দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। স্বামী বিবেকানন্দের বক্তব্যের মূল উদ্দেশ্য ছিল—জ্ঞানকে কেবল পণ্ডিতসমাজের মধ্যে আবদ্ধ না রেখে সাধারণ মানুষের কাছেও পৌঁছে দেওয়া।
৫. সাধারণ মানুষের ভাষার গুরুত্ব
স্বামী বিবেকানন্দের মতে, যে ভাষায় মানুষ স্বাভাবিকভাবে কথা বলে, সেই ভাষাই তার কাছে সবচেয়ে সহজ ও স্বাভাবিক।
এই কারণেই তিনি চলিত ভাষাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর কাছে ভাষার সৌন্দর্য শুধু কঠিন শব্দ, সংস্কৃতনির্ভর বাক্য বা অতিরিক্ত অলংকারে নয়; বরং ভাবের স্বচ্ছতা ও প্রকাশের শক্তিতেই ভাষার প্রকৃত সৌন্দর্য।
অর্থাৎ—
সহজ ভাষা → সহজে ভাব প্রকাশ → সহজে বোঝা → সাধারণ মানুষের কাছে জ্ঞানের প্রসার।
৬. কলকাতার ভাষাকে ভিত্তি করার প্রসঙ্গ
প্রবন্ধে স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর সময়ের ভাষাগত পরিবর্তনও লক্ষ্য করেছিলেন। তিনি দেখেছিলেন যে যাতায়াত ও যোগাযোগের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন অঞ্চলের ভাষাগত পার্থক্য ধীরে ধীরে কমছে এবং কলকাতার ভাষা বৃহত্তর বাংলায় ক্রমশ বেশি প্রচলিত হচ্ছে।
তাই পুস্তকের ভাষা ও ঘরে ব্যবহৃত কথ্য ভাষার মধ্যে দূরত্ব কমাতে হলে তিনি কলকাতার প্রচলিত ভাষাকে ভিত্তি করার কথা বলেন। তবে এর সঙ্গে তিনি আঞ্চলিক সংকীর্ণতা বা ‘গ্রাম্য ঈর্ষা’ পরিত্যাগ করার কথাও বলেছেন।
৭. অতিরিক্ত সংস্কৃতায়ন ও অলংকারের বিরোধিতা
স্বামী বিবেকানন্দ বাংলা ভাষাকে সংস্কৃতের অন্ধ অনুকরণে ভারী করে তোলার বিরোধিতা করেছেন।
তাঁর মতে, ভাষায় অতিরিক্ত কঠিন শব্দ, দীর্ঘ বাক্য, জটিল বিশেষণ এবং অপ্রয়োজনীয় অলংকার ব্যবহার করলে ভাষা তার স্বাভাবিক সৌন্দর্য হারায়।
তিনি ব্যঙ্গাত্মক ও রসিক ভঙ্গিতে বোঝাতে চেয়েছেন—শুধু সাজসজ্জা থাকলেই কোনো কিছু সুন্দর হয় না। সাজ যদি মূল সৌন্দর্যকে ঢেকে দেয়, তাহলে সেই সাজই হয়ে ওঠে অসুবিধার কারণ।
তাই তাঁর ভাষাচিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—
ভাষাকে সাজাতে হবে, কিন্তু সাজের ভারে ভাষাকে দুর্বোধ্য করা যাবে না।
৮. ‘প্যাঁচওয়া বিশেষণ’-এর তাৎপর্য
প্রবন্ধে স্বামী বিবেকানন্দ জটিল ও অতিরিক্ত বিশেষণ ব্যবহারের প্রবণতাকে ব্যঙ্গ করেছেন। ‘প্যাঁচওয়া বিশেষণ’ বলতে মূলত জটিল ও ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে ব্যবহৃত বিশেষণ বোঝানো হয়েছে।
এ ধরনের ভাষা পাঠকের কাছে মূল বক্তব্যকে স্পষ্ট না করে বরং আরও কঠিন করে তোলে।
তাই লেখকের বক্তব্য—ভাব আগে, ভাষার বাহুল্য পরে।
৯. বুদ্ধ, চৈতন্য ও রামকৃষ্ণের প্রসঙ্গ
স্বামী বিবেকানন্দ দেখিয়েছেন যে যাঁরা যুগে যুগে সাধারণ মানুষের মধ্যে সত্য, ধর্ম ও মানবতার বাণী প্রচার করেছেন, তাঁরা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর জন্য সহজ ভাষাকেই গুরুত্ব দিয়েছেন।
এই দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে জনসাধারণকে বাদ দিয়ে কোনো জ্ঞানচর্চা বা সামাজিক আন্দোলন পূর্ণতা পেতে পারে না।
ভাষা যদি সাধারণ মানুষের বোধগম্য হয়, তবে জ্ঞান সমাজের বৃহত্তর অংশের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।
১০. প্রবন্ধের প্রধান বক্তব্য
‘বাঙ্গালা ভাষা’ প্রবন্ধের বক্তব্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সংক্ষেপ করা যায়—
ভাষার প্রধান উদ্দেশ্য হলো ভাবের সহজ প্রকাশ।
লেখার ভাষা সাধারণ মানুষের বোধগম্য হওয়া উচিত।
অতিরিক্ত সংস্কৃতনির্ভর ও কৃত্রিম ভাষা সাধারণ পাঠকের কাছে দুর্বোধ্য হতে পারে।
মানুষের মুখের ভাষাকে লেখার ভাষার কাছাকাছি আনা দরকার।
অপ্রয়োজনীয় অলংকার ও জটিল বিশেষণ ভাষার স্বাভাবিক সৌন্দর্য নষ্ট করতে পারে।
ভাষার উন্নতি মানুষের সঙ্গে তার যোগাযোগের মাধ্যমে ঘটে।
জ্ঞানকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হলে সহজ ভাষার প্রয়োজন।
আঞ্চলিক সংকীর্ণতা দূর করে বৃহত্তর বাংলা ভাষার ঐক্যের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।
১১. প্রবন্ধের ভাষাশৈলী
স্বামী বিবেকানন্দের ভাষাশৈলী এই প্রবন্ধের অন্যতম আকর্ষণ।
তাঁর লেখায় দেখা যায়—
যুক্তিনির্ভর আলোচনা
ব্যঙ্গ ও রসিকতা
সহজবোধ্য বক্তব্য
উদাহরণের ব্যবহার
তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ
সরাসরি বক্তব্য
কথ্যভঙ্গির স্বাভাবিকতা
তিনি শুধু তত্ত্বের কথা বলেননি; নানা উদাহরণ ও তুলনার সাহায্যে নিজের বক্তব্যকে জীবন্ত করে তুলেছেন।
১২. ‘বাঙ্গালা ভাষা’ প্রবন্ধের গুরুত্ব
এই প্রবন্ধের গুরুত্ব শুধু বাংলা ভাষার ইতিহাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বর্তমান সময়েও এর বক্তব্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
আজ সংবাদপত্র, শিক্ষা, ডিজিটাল মাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা অনলাইন শিক্ষায় মানুষের কাছে তথ্য পৌঁছে দেওয়ার জন্য সহজ, স্পষ্ট ও স্বাভাবিক ভাষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্বামী বিবেকানন্দের ভাষাচিন্তা আমাদের শেখায়—
“যে ভাষা মানুষ বুঝতে পারে, সেই ভাষাই মানুষের মধ্যে জ্ঞান ও চিন্তার আলো ছড়াতে পারে।”
১৩. পরীক্ষার জন্য বিশেষভাবে মনে রাখবে
লেখক
স্বামী বিবেকানন্দ
প্রবন্ধ
বাঙ্গালা ভাষা
উৎস
‘উদ্বোধন’ পত্রিকার সম্পাদককে লেখা চিঠির অংশ
চিঠি লেখার তারিখ
২০ ফেব্রুয়ারি, ১৯০০ খ্রিস্টাব্দ
মূল গ্রন্থ
ভাববার কথা
প্রধান বক্তব্য
সহজ, স্বাভাবিক, চলিত ও সাধারণ মানুষের বোধগম্য ভাষার পক্ষে মতপ্রকাশ।
প্রধান বিরোধিতা
অতিরিক্ত কৃত্রিমতা, দুর্বোধ্যতা, অপ্রয়োজনীয় অলংকার ও জটিল ভাষার বিরুদ্ধে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন