সর্বাধিক পঠিত

খিঁচুনি হলেই কি শুধু ‘ফিট’? বারবার এমন হলে অবহেলা নয়—হতে পারে এপিলেপসি, সঠিক চিকিৎসায় নিয়ন্ত্রণ সম্ভব

 

🏥 GRAM BANGLA HEALTH GUIDE


বিশেষ স্বাস্থ্য প্রতিবেদন | ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

হঠাৎ একজন মানুষ মাটিতে পড়ে গেলেন, শরীর শক্ত হয়ে হাত-পা কাঁপতে শুরু করল, কিছুক্ষণ পর জ্ঞান ফিরল—গ্রামবাংলায় এমন ঘটনাকে অনেক সময় নানা কুসংস্কার বা ভুল ধারণার সঙ্গে যুক্ত করা হয়। কিন্তু এমন ঘটনা অনেক ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্নায়ুরোগের লক্ষণ হতে পারে, যার নাম Epilepsy বা মৃগী রোগ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রায় ৫ কোটি মানুষ এপিলেপসিতে আক্রান্ত। সঠিকভাবে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা হলে আক্রান্তদের একটি বড় অংশের খিঁচুনি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। WHO বলছে, যথাযথ চিকিৎসায় প্রায় ৭০% মানুষ খিঁচুনিমুক্ত থাকতে পারেন।

এপিলেপসি আসলে কী?

এপিলেপসি একটি দীর্ঘমেয়াদি স্নায়বিক রোগ। মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষে অস্বাভাবিক অতিরিক্ত বৈদ্যুতিক কার্যকলাপের ফলে বারবার খিঁচুনি বা seizure হতে পারে।

তবে একবার খিঁচুনি হলেই যে কারও এপিলেপসি হয়েছে—এমন নয়। জ্বর, রক্তে শর্করার সমস্যা, মাথায় আঘাতসহ বিভিন্ন কারণেও seizure হতে পারে। তাই প্রথমবার এমন ঘটনা ঘটলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


⚠️ শুধু হাত-পা কাঁপাই নয়—আর কী কী লক্ষণ হতে পারে?

এপিলেপসির খিঁচুনি প্রত্যেকের ক্ষেত্রে একই রকম হয় না।

সম্ভাব্য লক্ষণগুলির মধ্যে রয়েছে—

  • হঠাৎ জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে পড়ে যাওয়া
  • শরীর শক্ত হয়ে যাওয়া
  • হাত-পা অনিয়ন্ত্রিতভাবে কাঁপা
  • কিছু সময়ের জন্য আশপাশ সম্পর্কে সচেতনতা হারানো
  • একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকা এবং ডাকলেও স্বাভাবিকভাবে সাড়া না দেওয়া
  • অস্বাভাবিক গন্ধ, স্বাদ বা অনুভূতি হওয়া
  • শরীরের কোনও অংশে হঠাৎ ঝাঁকুনি
  • খিঁচুনির পর কিছু সময় বিভ্রান্ত বা ঘুমঘুম থাকা
  • কখনও অস্বাভাবিক আচরণ বা উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটাচলা করা

WHO এবং NHS-এর তথ্য অনুযায়ী, seizure-এর ধরন নির্ভর করে মস্তিষ্কের কোন অংশে অস্বাভাবিক বৈদ্যুতিক কার্যকলাপ শুরু হচ্ছে এবং তা কতটা ছড়াচ্ছে তার ওপর।


🧠 কেন হতে পারে এপিলেপসি?

সব রোগীর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। সম্ভাব্য কারণের মধ্যে রয়েছে—

  • জন্মের আগে বা জন্মের সময় মস্তিষ্কে ক্ষতি
  • জেনেটিক বা বংশগত কিছু কারণ
  • মাথায় গুরুতর আঘাত
  • স্ট্রোক
  • মস্তিষ্কের সংক্রমণ
  • নিউরোসিস্টিসারকোসিসের মতো কিছু সংক্রমণ
  • মস্তিষ্কের কিছু গঠনগত সমস্যা
  • কিছু ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের টিউমার

তবে অনেক রোগীর ক্ষেত্রে কারণ অজানাও থেকে যেতে পারে।


🔬 কী কী পরীক্ষা করতে পারেন চিকিৎসক?

এপিলেপসি নির্ণয়ের ক্ষেত্রে রোগীর ঘটনা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খিঁচুনি শুরু হওয়ার আগে কী হয়েছিল, কতক্ষণ স্থায়ী হয়েছিল এবং পরে রোগীর কী অবস্থা হয়েছিল—পরিবারের কেউ যদি ঘটনাটি দেখে থাকেন, সেই তথ্য চিকিৎসককে জানানো উপকারী।

প্রয়োজনে চিকিৎসক করতে পারেন—

EEG: মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপ পরীক্ষা করার জন্য।

MRI বা CT Scan: মস্তিষ্কে কোনও গঠনগত সমস্যা আছে কি না তা দেখতে।

রক্ত পরীক্ষা: অন্য কোনও শারীরিক কারণ খুঁজতে।

কিছু ক্ষেত্রে ECG, জেনেটিক পরীক্ষা বা অন্যান্য বিশেষায়িত পরীক্ষাও প্রয়োজন হতে পারে।


💊 চিকিৎসা কী?

এপিলেপসির প্রধান চিকিৎসাগুলির একটি হলো anti-seizure medicine বা খিঁচুনি নিয়ন্ত্রণের ওষুধ।

কোন ওষুধ, কত মাত্রায় এবং কতদিন চলবে—তা seizure-এর ধরন, রোগীর বয়স, অন্যান্য রোগ, গর্ভধারণের সম্ভাবনা এবং অন্যান্য চিকিৎসাগত বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। তাই অন্য রোগীর প্রেসক্রিপশন দেখে নিজের ওষুধ শুরু করা উচিত নয়।

অনেকের ক্ষেত্রে ওষুধেই ভালোভাবে খিঁচুনি নিয়ন্ত্রণ করা যায়। কিছু রোগীর ক্ষেত্রে ওষুধে পর্যাপ্ত নিয়ন্ত্রণ না হলে বিশেষায়িত কেন্দ্রে epilepsy surgery, vagus nerve stimulation বা নির্দিষ্ট ধরনের চিকিৎসা বিবেচনা করা হতে পারে।

গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা

নিজে থেকে ওষুধ বন্ধ করা বা ডোজ কমানো বিপজ্জনক হতে পারে।

খিঁচুনি দীর্ঘদিন না হলেও ওষুধ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত রোগীর চিকিৎসকই নেবেন। WHO-র নির্দেশনাতেও চিকিৎসা বন্ধের আগে ব্যক্তিগত ও চিকিৎসাগত বিষয় বিবেচনার কথা বলা হয়েছে।


🚑 কারও খিঁচুনি শুরু হলে পরিবারের কী করবেন?

এটি প্রত্যেক পরিবারের জানা অত্যন্ত জরুরি।

যা করবেন

  • শান্ত থাকুন।
  • রোগীকে নিরাপদ জায়গায় রাখুন।
  • মাথার নিচে নরম কিছু দিন।
  • সম্ভব হলে রোগীকে কাত করে রাখুন, যাতে শ্বাস নিতে সুবিধা হয়।
  • গলার আঁটসাঁট পোশাক আলগা করুন।
  • খিঁচুনি কতক্ষণ চলছে, সময় লক্ষ্য করুন।
  • আশপাশের শক্ত বা ধারালো জিনিস সরিয়ে দিন।
  • খিঁচুনি থামার পরও রোগীর পাশে থাকুন।

❌ যা করবেন না

মুখের ভিতরে চামচ, আঙুল, কাপড়, জল বা কোনও বস্তু ঢোকাবেন না।

জোর করে হাত-পা চেপে ধরে রাখবেন না এবং রোগীকে ঝাঁকাবেন না। WHO-এর seizure first-aid guidance-ও মুখে কোনও বস্তু না দেওয়া এবং রোগীকে আঘাত থেকে নিরাপদ রাখার ওপর জোর দেয়।


🚨 কখন জরুরি হাসপাতালে যেতে হবে?

নিচের পরিস্থিতিতে জরুরি চিকিৎসা দরকার হতে পারে—

  • এটি যদি প্রথমবারের মতো খিঁচুনি হয়
  • খিঁচুনি ৫ মিনিটের বেশি স্থায়ী হয়
  • একটির পর আরেকটি খিঁচুনি হয় এবং মাঝখানে স্বাভাবিক জ্ঞান না ফেরে
  • খিঁচুনির পর স্বাভাবিকভাবে জ্ঞান বা শ্বাস-প্রশ্বাস ফিরে না আসে
  • গুরুতর আঘাত লাগে
  • পানিতে পড়ে যাওয়া বা অন্য কোনও বিপজ্জনক পরিস্থিতি ঘটে
  • গর্ভাবস্থায় খিঁচুনি হয়

দীর্ঘস্থায়ী বা পরপর খিঁচুনি একটি মেডিক্যাল ইমার্জেন্সি হতে পারে।


🏥 কোথায় চিকিৎসা নেবেন?

এপিলেপসির জন্য সাধারণত Neurology/Neuromedicine বিভাগে চিকিৎসা নেওয়া হয়।

আজকের প্রতিবেদনে উদাহরণ হিসেবে নেওয়া হচ্ছে কলকাতার ****।

হাসপাতালের সরকারি ওয়েবসাইটে Neurology (Neuromedicine) বিভাগ রয়েছে এবং বিভাগটির বর্তমান তথ্যও প্রকাশ করা হয়েছে।

তাই পশ্চিমবঙ্গের কোনও রোগীর বারবার খিঁচুনি হলে বা এপিলেপসির সন্দেহ থাকলে প্রথমে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে Neurology/Neuromedicine বিভাগে মূল্যায়ন করানো যেতে পারে।

শিশুদের ক্ষেত্রে Pediatric Neurology-এর প্রয়োজন হতে পারে। জটিল বা ওষুধে নিয়ন্ত্রণ না হওয়া রোগীর ক্ষেত্রে চিকিৎসক বিশেষায়িত epilepsy service বা referral centre-এর পরামর্শ দিতে পারেন।


🌾 গ্রাম বাংলার মানুষের জন্য বিশেষ বার্তা

এপিলেপসি ছোঁয়াচে রোগ নয়। এই রোগ নিয়ে লজ্জা, ভয় বা সামাজিক কুসংস্কারের কোনও স্থান থাকা উচিত নয়।

খিঁচুনি হলে রোগীকে মারধর করা, ঝাড়ফুঁক করা, মুখে জোর করে কিছু ঢোকানো বা চিকিৎসা বিলম্ব করা বিপজ্জনক হতে পারে। রোগীকে নিরাপদে রেখে যথাযথ চিকিৎসা নেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।

WHO-ও এপিলেপসির সঙ্গে যুক্ত সামাজিক stigma ও discrimination কমানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।


🩺 শেষ কথা

এপিলেপসি মানেই জীবন থেমে যাওয়া নয়। সঠিক রোগ নির্ণয়, নিয়মিত চিকিৎসা, ওষুধ যথাযথভাবে গ্রহণ এবং পরিবারের সহযোগিতার মাধ্যমে অনেক রোগীর খিঁচুনি ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

মনে রাখুন—প্রথমবার খিঁচুনি হলে অবহেলা নয়, বারবার হলে কুসংস্কার নয়, দীর্ঘক্ষণ চললে অপেক্ষা নয়—প্রয়োজন দ্রুত চিকিৎসা।

GRAM BANGLA HEALTH GUIDE-এর উদ্দেশ্য রোগ নির্ণয় বা ব্যক্তিগত চিকিৎসার পরিবর্তে সাধারণ মানুষকে স্বাস্থ্য সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য ও সঠিক চিকিৎসা-সন্ধানের পথ দেখানো। ব্যক্তিগত চিকিৎসার জন্য যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

তথ্যসূত্র: World Health Organization (WHO), NHS এবং IPGME&R–SSKM Hospital-এর সরকারি তথ্য।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন

🎧 LIVE FM RADIO




🔊 Volume