সর্বাধিক পঠিত

মাথার উপর নিজের ছাদটুকুও জোটেনি! এক বছরের বেশি সময় ধরে অন্যের ফার্মহাউসে প্রাক্তন উপরাষ্ট্রপতি জগদীপ ধনকড়—প্রশাসনের কাছে কি তবে সাধারণ মানুষের প্রশ্নও একই?

 নয়াদিল্লি, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | গ্রাম বাংলা রিপোর্ট


দে


শের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে থাকা একজন মানুষ। পাঁচ বছর নয়, দশ বছর নয়—মাত্র এক বছরেরও বেশি সময় আগে দায়িত্ব ছেড়েছেন। অথচ আজও নিজের জন্য সরকারি বাসস্থানের অপেক্ষায় রয়েছেন ভারতের প্রাক্তন উপরাষ্ট্রপতি জগদীপ ধনকড়। বর্তমানে তিনি দিল্লির ছত্তরপুরে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল লোকদল নেতা অভয় সিং চৌটালার একটি ব্যক্তিগত ফার্মহাউসে থাকছেন বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানা যাচ্ছে। 


বিষয়টি শুধু একজন প্রাক্তন সাংবিধানিক পদাধিকারীর বাসস্থানের প্রশ্ন নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সরকারি ব্যবস্থা কতটা দ্রুত কাজ করে, প্রশাসনিক সুযোগ-সুবিধা বাস্তবে কীভাবে কার্যকর হয় এবং সাধারণ নাগরিক সেই ব্যবস্থার কাছ থেকে কী আশা করতে পারেন—সেই বড় প্রশ্ন।


২১ জুলাই ২০২৫—হঠাৎ ইস্তফা


২০২৫ সালের ২১ জুলাই আচমকাই উপরাষ্ট্রপতির পদ থেকে ইস্তফা দেন জগদীপ ধনকড়। তিনি তাঁর পদত্যাগপত্রে স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন এবং সংবিধানের ৬৭(এ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তাৎক্ষণিকভাবে পদত্যাগ করেন। 


তখন তাঁর এই সিদ্ধান্ত গোটা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে যথেষ্ট আলোড়ন তৈরি করেছিল। এরপর ধীরে ধীরে তিনি জনসমক্ষে অনেকটাই কম দেখা যেতে থাকেন।


পদত্যাগের পর ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি অভয় সিং চৌটালার ছত্তরপুরের ফার্মহাউসে চলে যান। তখন সেটিকে সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবেই দেখা হয়েছিল। 


কিন্তু সেই ‘সাময়িক’ ঠিকানাই এক বছরের বেশি সময় ধরে তাঁর বাসস্থান হয়ে রয়েছে।



---


প্রাক্তন উপরাষ্ট্রপতির জন্য কী সুবিধা রয়েছে?


ভারতের প্রাক্তন উপরাষ্ট্রপতিদের জন্য আইন ও সরকারি বিধিতে নির্দিষ্ট কিছু অবসরকালীন সুবিধার ব্যবস্থা রয়েছে। 


The Vice-President's Pension Act অনুযায়ী অবসরপ্রাপ্ত উপরাষ্ট্রপতির জন্য সরকারি বাসস্থানের ব্যবস্থার কথাও রয়েছে। সরকারি আবাসন পাওয়া গেলে Type-VIII bungalow দেওয়ার বিধান রয়েছে; নির্দিষ্ট জায়গায় এমন সরকারি বাসস্থান না থাকলে বিকল্প উপযুক্ত বাসস্থানের ব্যবস্থার কথাও আইনে উল্লেখ রয়েছে। 


অর্থাৎ প্রশ্নটি শুধু “ধনকড়কে একটি বাংলো দেওয়া হল না কেন?”—এতটুকু নয়।


বড় প্রশ্ন হল—


> একজন প্রাক্তন সাংবিধানিক পদাধিকারীর জন্য যে প্রশাসনিক ব্যবস্থা থাকার কথা, সেটি এক বছরের বেশি সময়েও কেন বাস্তবায়িত হল না?




বর্তমান প্রতিবেদনে প্রশাসনিক সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, এখনও পর্যন্ত ধনকড়ের নামে সরকারি বাসস্থান বরাদ্দ হয়নি। তাঁর দফতরও এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য করেনি। 



---


ভেঙ্কাইয়া নায়ডুর ক্ষেত্রে যা হয়েছিল, ধনকড়ের ক্ষেত্রে কেন এত দেরি?


ধনকড়ের আগে উপরাষ্ট্রপতি ছিলেন এম ভেঙ্কাইয়া নায়ডু। সংবাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, তাঁর অবসর-পরবর্তী সরকারি বাসস্থানের ব্যবস্থা তুলনামূলক দ্রুত হয়েছিল।


সেই তুলনা থেকেই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—একই সাংবিধানিক পদ থেকে অবসর নেওয়া দুই ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার এতটা পার্থক্য কেন?


তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি—ধনকড়কে কেন এখনও সরকারি বাসস্থান দেওয়া হয়নি, তার সরকারি ব্যাখ্যা এখনও প্রকাশ্যে স্পষ্ট নয়। তাই এটিকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, প্রশাসনিক অবহেলা বা অন্য কোনও কারণ বলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো এখনই ঠিক হবে না।



---


অসুস্থ প্রাক্তন উপরাষ্ট্রপতি, তবু এক বছরের অপেক্ষা


ধনকড়ের বিষয়টি আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে তাঁর শারীরিক অবস্থার কারণে।


২০২৫ সালে তাঁর ইস্তফার কারণ হিসেবে স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। এর আগে তাঁর হৃদ্‌যন্ত্র-সংক্রান্ত চিকিৎসা ও অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টির খবরও প্রকাশ্যে এসেছিল। 


এই পরিস্থিতিতে একজন প্রবীণ প্রাক্তন সাংবিধানিক পদাধিকারীর দীর্ঘদিন একটি ব্যক্তিগত ফার্মহাউসে থাকার বিষয়টি প্রশাসনিক সংবেদনশীলতার প্রশ্নও সামনে আনে।


তবে তাঁর বর্তমান স্বাস্থ্য পরিস্থিতি সম্পর্কে অনুমান না করে সরকারি বা নির্ভরযোগ্য চিকিৎসা-সূত্রের তথ্যের উপরই নির্ভর করা উচিত।



---


ধনকড়ের ঘটনা আসলে সাধারণ মানুষের কাছে আরও বড় প্রশ্ন তুলে দেয়


এখানেই এই খবরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক।


ভারতের প্রাক্তন উপরাষ্ট্রপতির মতো একজন উচ্চপদস্থ ব্যক্তির জন্য যদি সরকারি নিয়মে বাসস্থানের ব্যবস্থা থাকার পরও বাস্তবে সেই ব্যবস্থা পেতে এক বছরের বেশি সময় লাগে, তাহলে দেশের একজন সাধারণ নাগরিক কীভাবে প্রশাসনিক পরিষেবা পাওয়ার অভিজ্ঞতা দেখছেন?


গ্রামবাংলার বহু পরিবার আজও—


নিজের বাড়ির জন্য সরকারি প্রকল্পের অপেক্ষায়,


আবাসন প্রকল্পের তালিকায় নাম ওঠার অপেক্ষায়,


জমির কাগজ সংশোধনের জন্য মাসের পর মাস দফতরে ঘুরছেন,


পেনশন বা ভাতার টাকা পাওয়ার জন্য বারবার আবেদন করছেন,


রাস্তা, পানীয় জল, নিকাশি কিংবা বিদ্যুতের মতো মৌলিক পরিষেবার জন্য আবেদন করছেন।



কেউ হয়তো কাঁচা ঘরে বর্ষার রাত কাটাচ্ছেন।

কেউ হয়তো অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন।

কেউ আবার সরকারি আবাসন প্রকল্পের অনুমোদন পেলেও বাস্তবে কাজ শুরু হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন।


তাই ধনকড়ের ঘটনা সাধারণ মানুষের কাছে শুধুমাত্র রাজনৈতিক খবর নয়—এটি প্রশাসনিক জবাবদিহির একটি প্রতীকী প্রশ্ন হয়ে উঠতে পারে।



---


“সরকারি সুবিধা” মানেই কি বাস্তবে দ্রুত পরিষেবা?


ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আইন ও নীতিতে সুবিধা নির্ধারিত থাকা এক বিষয়, আর সেই সুবিধা সময়মতো বাস্তবে পৌঁছে দেওয়া অন্য বিষয়।


কাগজে কোনও প্রকল্প থাকলেই মানুষের সমস্যার সমাধান হয় না।


একজন কৃষক যদি কৃষি-সহায়তার টাকা পাওয়ার যোগ্য হন কিন্তু সময়মতো টাকা না পান, তাহলে তাঁর কাছে প্রকল্পের অস্তিত্বের চেয়ে সময়মতো পরিষেবা পাওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ।


একটি পরিবার যদি আবাসন প্রকল্পের তালিকায় থাকে কিন্তু মাথার উপর ছাদ তৈরি না হয়, তাহলে সরকারি পরিসংখ্যানের চেয়ে তার কাছে বাস্তব ঘরটাই গুরুত্বপূর্ণ।


এই জায়গাতেই ধনকড়ের ঘটনা একটি বড় শিক্ষা দেয়—


“কোনও সুবিধা প্রাপ্য”—এই কথার সঙ্গে “সেই সুবিধা বাস্তবে কবে পাওয়া গেল”—এই প্রশ্নটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।



---


গ্রামবাংলার মানুষের প্রত্যাশা কোথায়?


গ্রামবাংলার মানুষ সরকারের কাছে আকাশচুম্বী কিছু চান না।


তাঁদের প্রত্যাশা খুব সাধারণ—


একটি নিরাপদ বাড়ি।

দুই বেলা খাবার।

চাষের জন্য জল ও সঠিক সহায়তা।

সন্তানের পড়াশোনার সুযোগ।

অসুস্থ হলে চিকিৎসা।

বৃদ্ধ হলে পেনশন।

কাজের সুযোগ।

এবং সরকারি দফতরে গেলে সম্মানের সঙ্গে পরিষেবা।


একজন প্রাক্তন উপরাষ্ট্রপতির সরকারি বাসস্থানের প্রশ্ন তাই আমাদের আরও বড় একটি বাস্তবতার দিকে তাকাতে বাধ্য করে।


দেশের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক কাঠামোর একজন মানুষ যদি নিজের প্রাপ্য সুবিধার জন্য দীর্ঘ অপেক্ষায় থাকেন, তাহলে সেই ব্যবস্থার নিচের স্তরে থাকা সাধারণ মানুষের সমস্যাগুলিকে আরও দ্রুত, আরও সংবেদনশীলভাবে দেখা কতটা জরুরি—সেটিই হওয়া উচিত মূল শিক্ষা।



---


গ্রাম বাংলা রিপোর্টের সম্পাদকীয় পর্যবেক্ষণ


এই ঘটনার ভিত্তিতে কাউকে দায়ী করা বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আরোপ করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। সরকারি ব্যাখ্যা প্রকাশ্যে না আসা পর্যন্ত অনুমানের জায়গা সীমিত রাখা প্রয়োজন।


কিন্তু এক বছরের বেশি সময় ধরে একজন প্রাক্তন উপরাষ্ট্রপতির সরকারি বাসস্থান না পাওয়ার বিষয়টি অবশ্যই প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্ন তৈরি করে।


আর সেই প্রশ্নের উত্তর শুধু জগদীপ ধনকড়ের জন্য নয়—দেশের সেই কোটি কোটি মানুষের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ, যারা প্রতিদিন সরকারি ব্যবস্থার দরজায় নিজেদের ন্যায্য অধিকার নিয়ে দাঁড়ান।


কারণ গণতন্ত্রে নাগরিকের মর্যাদা শুধু সংবিধানের পাতায় নয়, সরকারি পরিষেবা পাওয়ার বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্যেও প্রতিফলিত হয়।


শেষ কথা একটাই—

“কোন প্রকল্পে কত টাকা বরাদ্দ হল?”—এর পাশাপাশি প্রশ্ন হওয়া উচিত, “সাধারণ মানুষ বাস্তবে কতটা সুবিধা পেলেন এবং কতদিন অপেক্ষা করতে হল?”


এই প্রশ্নের উত্তরই প্রশাসনের প্রকৃত সাফল্যের মাপকাঠি।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন
Gram Bangla Report
Gram Bangla Report

🎧 LIVE FM RADIO




🔊 Volume