আর মাত্র কয়েক দিনের অপেক্ষা, বাংলাজুড়ে আগমনী আবহ। কবে বোধন, কবে নবপত্রিকা, অষ্টমীর অঞ্জলি, নবমীর হোম আর দশমীর সিঁদুর খেলা? এক প্রতিবেদনে পুজোর দিনক্ষণ ও বিশেষ আচার।
নিজস্ব প্রতিবেদন | পশ্চিমবঙ্গ
আজ ১০ অক্টোবর, শনিবার। মহালয়ার ভোরে মহিষাসুরমর্দিনীর সুর, গঙ্গার ঘাটে তর্পণ, আকাশে শরতের মেঘ আর পুজোর আগমনী আবহ—সব মিলিয়ে বাঙালির মনে শুরু হয়ে গিয়েছে শারদোৎসবের প্রতীক্ষা। পিতৃপক্ষের অবসান এবং দেবীপক্ষের সূচনার এই দিনে বাংলার ঘরে ঘরে এখন একটাই প্রশ্ন—আর কত দিন বাকি মা দুর্গার আগমনের?
উত্তরটা খুব বেশি দূরে নয়। আগামী ১৬ অক্টোবর শুক্রবার মহাষষ্ঠীর আচার দিয়ে শুরু হবে দুর্গাপুজোর প্রধান পর্ব। এরপর সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী পেরিয়ে ২১ অক্টোবর বুধবার বিজয়া দশমীতে আসবে প্রতিমা বিসর্জন ও বিদায়ের মুহূর্ত।
এবারের দুর্গাপুজোয় তিথির বিন্যাসের কারণে সপ্তমী তিথি দু’টি ক্যালেন্ডার দিনে পড়ছে। ফলে ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত পুজোর গুরুত্বপূর্ণ পর্বগুলি ছয়টি ক্যালেন্ডার দিনের মধ্যে বিস্তৃত। তাই পুজোর দিনক্ষণ জানার পাশাপাশি স্থানীয় পুজো কমিটি ও পুরোহিতের নির্ধারিত সময়সূচিও দেখে নেওয়া জরুরি।
ষষ্ঠী থেকে দশমী—২০২৬ সালের দুর্গাপুজোর সম্পূর্ণ নির্ঘণ্ট
মহাষষ্ঠী — ১৬ অক্টোবর, শুক্রবার
মহাষষ্ঠী থেকেই দুর্গাপুজোর মূল উৎসবের আবহ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী এই দিনে দেবীর বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাসের আচার পালিত হয়। বহু মণ্ডপে দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়তে শুরু করে। প্রতিমার সাজসজ্জা, আলোকসজ্জা এবং মণ্ডপের শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিও এই সময়ে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছয়।
বাঙালির কাছে ষষ্ঠী মানে শুধু পুজোর সূচনা নয়, দীর্ঘ অপেক্ষার পর পরিবার-পরিজন নিয়ে ঠাকুর দেখতে বেরিয়ে পড়ার আনন্দও।
মহাসপ্তমী — ১৭ ও ১৮ অক্টোবর, শনিবার ও রবিবার
এবারের পঞ্জিকায় সপ্তমী তিথির বিস্তার দুই ক্যালেন্ডার দিনে পড়েছে। এই পর্বে নবপত্রিকা স্নান, স্থাপন ও সপ্তমীর পূজার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। প্রচলিত রীতিতে কলাবউকে নবপত্রিকার অংশ হিসেবে সাজিয়ে দেবীর পাশে স্থাপন করা হয়।
সপ্তমী থেকেই বহু পুজোমণ্ডপে দর্শনার্থীদের ভিড় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। পরিবার নিয়ে প্যান্ডেল হপিং, বন্ধুদের সঙ্গে ঘোরাঘুরি এবং বিভিন্ন এলাকার প্রতিমা দর্শনের পরিকল্পনা শুরু হয় এই সময়ে।
মহাষ্টমী — ১৯ অক্টোবর, সোমবার
দুর্গাপুজোর সবচেয়ে আবেগঘন দিনগুলির অন্যতম মহাষ্টমী। এই দিনে বহু পুজোমণ্ডপে অঞ্জলি দেওয়ার জন্য ভোর থেকেই ভক্তদের সমাগম হয়। কুমারীপুজো এবং সন্ধিপুজোও অনেক স্থানে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে পালিত হয়।
সন্ধিপুজো অষ্টমী ও নবমী তিথির সন্ধিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত। এর নির্দিষ্ট সময় পঞ্জিকা অনুযায়ী নির্ধারিত হয়। পঞ্জিকাভেদে সময়ের পার্থক্য থাকতে পারে, তাই অঞ্জলি বা সন্ধিপুজোয় অংশ নিতে নিজের পুজোমণ্ডপের ঘোষিত সময় জেনে নেওয়া উচিত।
মহানবমী — ২০ অক্টোবর, মঙ্গলবার
মহানবমীতে দেবীর পূজার পাশাপাশি অনেক মণ্ডপে হোম-যজ্ঞ ও বিশেষ ধর্মীয় আচার পালিত হয়। পুজোর আনন্দ তখন চরমে পৌঁছয়। আলোকসজ্জা, প্রতিমা দর্শন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর জন্য নবমীর দিনটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
তবে নবমীর আনন্দের মধ্যেই অনেকের মনে শুরু হয় বিদায়ের বিষণ্ণতা। কারণ, পরের দিনই বিজয়া দশমী।
বিজয়া দশমী — ২১ অক্টোবর, বুধবার
দুর্গাপুজোর শেষ প্রধান পর্ব বিজয়া দশমী। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী এই দিনে দেবীর বিসর্জন, দেবীবরণ, সিঁদুর খেলা এবং বিজয়ার শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠিত হয়। বিভিন্ন পুজো কমিটির বিসর্জনের সময় ও ব্যবস্থা আলাদা হতে পারে।
দশমী মানে শুধু উৎসবের সমাপ্তি নয়; একে অপরকে শুভেচ্ছা জানানো, সম্পর্কের বন্ধন আরও দৃঢ় করা এবং আগামী বছরের পুজোর অপেক্ষা শুরু করার দিনও।
কেন মহালয়া থেকেই শুরু হয় পুজোর কাউন্টডাউন?
মহালয়া বাঙালির ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। প্রচলিত বিশ্বাসে এই দিন পিতৃপক্ষের অবসান এবং দেবীপক্ষের সূচনার সঙ্গে যুক্ত। ভোরে মহিষাসুরমর্দিনী শোনা, পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে তর্পণ এবং দেবীর আগমনী গান—সব মিলিয়ে পুজোর আবহ তৈরি হয়।
যদিও মহালয়ার দিন থেকেই বাঙালির মনে উৎসবের সূচনা ঘটে, দুর্গাপুজোর প্রধান আচার শুরু হয় ষষ্ঠী থেকে। এই ব্যবধানের দিনগুলিতেই শহর ও গ্রামে প্যান্ডেলের শেষ মুহূর্তের কাজ, প্রতিমার সাজ, কেনাকাটা এবং ভ্রমণের পরিকল্পনা তুঙ্গে ওঠে।
গ্রাম বাংলার পুজোয় কী কী বিশেষ আকর্ষণ থাকতে পারে?
দুর্গাপুজো মানেই শুধু কলকাতার বড় বড় মণ্ডপ নয়। পশ্চিমবঙ্গের গ্রামাঞ্চলেও রয়েছে নিজস্ব ঐতিহ্যের পুজো—কোথাও বনেদি বাড়ির বহু বছরের রীতি, কোথাও সর্বজনীন পুজোর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কোথাও আবার স্থানীয় শিল্পীদের হাতে তৈরি প্রতিমা ও মণ্ডপসজ্জা।
গ্রামের পুজোয় স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ, পারিবারিক মিলন, ঢাকের আওয়াজ, প্রসাদ বিতরণ এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বিশেষ মাত্রা যোগ করে। অনেক জায়গায় পুজোকে ঘিরে ছোট ব্যবসায়ী, মৃৎশিল্পী, ঢাকি, আলোকসজ্জার কর্মী এবং অস্থায়ী দোকানদারদের আয়ের সুযোগ তৈরি হয়।
এই কারণেই দুর্গাপুজো ধর্মীয় উৎসবের পাশাপাশি বাংলার সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
প্যান্ডেল হপিংয়ের আগে কয়েকটি বিষয় মনে রাখুন
১. ভিড় এড়াতে সম্ভব হলে আগে থেকেই যাতায়াতের পরিকল্পনা করুন।
২. কলকাতা বা অন্য শহরের ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের নির্দেশিকা দেখে বেরোন।
৩. শিশু ও প্রবীণদের সঙ্গে থাকলে নির্দিষ্ট মিলনস্থল ঠিক করে রাখুন।
৪. মণ্ডপের ভিতরে ও বাইরে নিরাপত্তাকর্মীদের নির্দেশ মেনে চলুন।
৫. অঞ্জলি, সন্ধিপুজো বা অন্যান্য আচার পালনের সময় স্থানীয় পুজো কমিটির সময়সূচি যাচাই করুন।
৬. বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকলে ছাতা বা রেইনকোট সঙ্গে রাখুন এবং আবহাওয়ার সরকারি আপডেট অনুসরণ করুন।
মা আসছেন—এখন অপেক্ষা শুধু কয়েক দিনের
মহালয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলার আকাশে যেন বদলে যায় অনুভূতির রং। ঢাকের শব্দ এখনও সর্বত্র শুরু না হলেও মনের ভিতরে আগমনী সুর বেজে ওঠে। কেউ নতুন পোশাক কেনার পরিকল্পনা করছেন, কেউ পরিবারের সঙ্গে ঠাকুর দেখার রুট তৈরি করছেন, আবার কেউ অপেক্ষা করছেন নিজের পাড়ার পুজোমণ্ডপের শেষ সাজ দেখার জন্য।
১৬ অক্টোবর ষষ্ঠীর সূচনা থেকে ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমী পর্যন্ত বাংলার পথে-ঘাটে ছড়িয়ে পড়বে উৎসবের রং। শহর থেকে গ্রাম, উত্তরবঙ্গ থেকে দক্ষিণবঙ্গ—সর্বত্রই পুজোকে ঘিরে তৈরি হবে আনন্দ, মিলন এবং স্মৃতির নতুন গল্প।
গ্রাম বাংলা রিপোর্টের পক্ষ থেকে সকল পাঠককে জানাই শারদীয়ার আগাম শুভেচ্ছা। পুজো কাটুক আনন্দে, নিরাপদে এবং সম্প্রীতির বন্ধনে।
গ্রাম বাংলা রিপোর্ট গ্রাম থেকে রাজ্য, বাংলার মানুষের কথা সঠিক সংবাদ • প্রয়োজনীয় তথ্য • মানুষের পাশে সাংবাদিকতা

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন